চুলের যত্নে ভিটামিন ই ক্যাপসুল ব্যবহারের নিয়ম
দিন দিন মানুষের চুল পড়ার হার বাড়ছে।সাথে থাকছে চুল নিয়ে নানাবিধ সমস্যা।যার জন্য দায়ী হচ্ছে আমাদের অনিয়ন্ত্রিত লাইফস্টাইল,খাদ্যাভ্যাস,বায়ুদূষণ,হরমোন ডিসব্যালেন্স সহ নানা কারণ। তাই চুলের যত্নে আমাদের উচিত নিজেদের জীবনধারাকে নিয়ন্ত্রনে আনা।আর এই চুলের যত্নে নিজেদেরকে আরও এক ধাপ এগিয়ে রাখতে সাহায্য করতে পারে ভিটামিন ই ক্যাপসুল।তাই আমরা আমাদের আজকের এই পর্ব সাজিয়েছি চুলের যত্নে ভিটামিন ই ক্যাপসুলের ব্যবহার নিয়ে। ভিটামিন ই ক্যাপসুল কিভাবে মাথায় ব্যবহার করব,কোন ভিটামিন ই ক্যাপসুল উৎকৃষ্ট,এর উপকারিতা, অপকারিতা ও খাওয়ার নিয়ম নিয়ে থাকছে আমাদের আজকের আলোচনা।বিস্তারিত জানতে আমাদের সাথেই থাকুন।
চুলের জন্য ভিটামিন ই ক্যাপসুল কোনটা ভালো
ফার্মেসীতে পাওয়া যায় এমন যেকোনো ভালো কোয়ালিটির ভিটামিন ই ক্যাপসুল ব্যবহার করা যেতে পারে।তবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।কারণ অনেকের মাথার স্ক্যাল্পে নানাবিধ সমস্যা থাকতে পারে।সে সমস্যা পর্যালোচনা করে একজন চিকিৎসক সিদ্ধান্ত দিবে যে রোগী ভিটামিন ই ক্যাপসুল ব্যবহার করতে পারবেন নাকি পারবেন না।আর যদি ভিটামিন ই ক্যাপসুল ব্যবহার করতে পারেন তাহলে সেটা কত মাত্রার।কারণ বাজারে বিভিন্ন পাওয়ারের ভিটামিন ই ক্যাপসুল পাওয়া যায়।
ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই ভালো ব্র্যান্ডের ক্যাপসুলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং অবশ্যই সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহার করতে হবে।তো চলুন বাংলাদেশে পাওয়া যায় এমন কয়েকটি স্বনামধন্য ব্র্যান্ডের ভিটামিন ই ক্যাপসুলের নাম দেখে নেওয়া যাক।
১.ইভিট (২০০/৪০০ মি.গ্রা.) -স্কয়ার
২.ইনোভিট ই (২০০/৪০০ মি.গ্রা.) -ইনসেপ্টা
৩.ভিটাম্যাক্স ই (২০০/৪০০ আই ইউ)- এস কে এফ
ই ক্যাপ এর উপকারিতা ও অপকারিতা
ভিটামিন ই ক্যাপসুলের যেমন অগণিত উপকার রয়েছে ঠিক তেমনই মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে এর অপকারিতাও রয়েছে।তো চলুন দেখে আসি ই ক্যাপ এর উপকারিতা ও অপকারিতা-
ই ক্যাপ এর উপকারিতা
ভিটামিন ই ক্যাপসুল চুল,ত্বক,ব্রেইন,হার্ট,পুরুষের বন্ধ্যাত্ব সহ আরও অনেক সমস্যার সমাধান হিসেবে কাজ করে।ধাপে ধাপে বলছি-
চুলের ক্ষেত্রে
ভিটামিন ই ক্যাপসুল চুলের সমস্যা সমাধানে পরীক্ষিত ও অত্যন্ত উপকারি।সঠিক রুটিন অনুযায়ী নিয়মিত ভিটামিন ই ক্যাপসুলের তেল মাথায় ব্যবহার করলে বা ভিটামিন ই ক্যাপসুল সেবন করলে চুলের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করে।যেমন-
- চুল পড়া কমায়
- চুল থেকে খুশকি দূর করে
- মাথার ত্বকে ব্লাড সার্কুলেশন বাড়ায়
- চুলের গোড়া মজবুত করে
- চুলের শুষ্কতা দূর করে আদ্রতা বজায় রাখে
- স্ক্যাল্পের চুলকানি কমায়
- চুলে দ্রুত বর্ধন ঘটায়
- মাথার ত্বক সুস্থ রাখে
- চুলের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে
- ক্ষতিগ্রস্থ চুল রিপেয়ার করে
ত্বকের ক্ষেত্রে
ভিটামিন ই ক্যাপসুল সেবন করলে বা মুখে মাখলে যেসব উপকার পাওয়া যায়-
- ত্বকের সৌন্দর্য ও উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে
- বার্ধক্য বা বয়সের ছাপ কমাতে সাহায্য করে
- সান বার্নের ক্ষতি থেকে ত্বককে রক্ষা করতে সাহায্য করে
- বলি রেখা,ব্রণের দাগসহ অন্যান্য পুরোনো দাগ দূর করতে সহায়তা করে।
মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে
যারা আলঝেইমার রোগে ভুগছেন অর্থাৎ যাদের কোনো কিছু মনে থাকতে চায় না বা সহজে যেকোনো কিছু ভুলে যায় তাদের ক্ষেত্রে এ ঔষধটি অনেক কাজে দিবে।
জয়েন্টের ব্যাথার ক্ষেত্রে
যারা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস রোগে ভুগছেন অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে জয়েন্টে ব্যাথায় ভুগছেন তারা এই ক্যাপসুলটি নিয়মিত সেবন করতে পারেন।
পুরুষের বন্ধ্যাত্ব সমস্যার ক্ষেত্রে
যে সকল ছেলের স্পার্ম কাউন্ট ও কোয়ালিটি কমে গিয়েছে এবং এই কারণে সেই দম্পতির বাচ্চা হচ্ছে না তারা এই ঔষধ অনায়াসে খেতে পারেন।মেইল ইনফারটিলিটির ক্ষেত্রে ভিটামিন ই ক্যাপসুল খুব ভালো কাজ করে।
হার্ট সুরক্ষার ক্ষেত্রে
যারা হার্টকে প্রটেক্টিভ রাখতে চান তারা চাইলে এই ঔষধ সেবন করতে পারেন।এটি হার্টের অপ্রয়োজনীয় কোলেস্টেরল কমাবে এবং হার্টকে এক্টিভ রাখবে।

ই ক্যাপ এর অপকারিতা
ভিটামিন ই ক্যাপসুলের তেমন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা অপকারিতা দেখা যায় না।তবে মাত্রাতিরিক্ত সেবনে আমাশয় দেখা দিতে পারে।এছাড়াও এলার্জির সমস্যাও দেখা দিতে পারে।যারা মাথায় বা ত্বকে এপ্লাই করতে চান তারা ব্যবহারের পূর্বে শরীরে মোটা চামড়া (কনুই বা হাটুর চামড়া) যেখানে আছে যেখানে আগে এপ্লাই করে দেখবেন কোনো রকম ইচিং বা চুলকানি হয় নাকি।যাদের ত্বক একটু সংবেদনশীল তারা সরাসরি ত্বকে এই ক্যাপসুলের তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করবেন।
ভিটামিন ই ক্যাপসুল চুলে ব্যবহারের নিয়ম
চুলের যত্নে ভিটামিন ই ক্যাপসুল বেশ কয়েকটি নিয়মে ব্যবহার করা যায়।নিচে ধাপে ধাপে প্রত্যেকটি নিয়ম বর্ণনা করা হলো-
১. তেলের সাথে মিশিয়ে
পরিমাণ মত নারিকেল তেল/অলিভ অয়েল/আমন্ড অয়েলের সাথে ২-৩ টি ভিটামিন ই ক্যাপসুল মিশিয়ে সেটা মাথার ত্বকে ৫-১০ মিনিট ম্যাসাজ করুন।পরে এই মিশ্রণ টি মাথায় আধা ঘন্টা বা এক ঘন্টা রেখে শ্যাম্পু দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন।
ফলাফল: চুলের দ্রুত বৃদ্ধি,চুল ঘন ও মসৃণ হয়।
২. হেয়ার মাস্ক তৈরি করে ব্যবহার
সামান্য পরিমাণ অ্যালোভেরা জেল ও নারিকেল তেলের সাথে ৩ টি ভিটামিন ই ক্যাপসুল ভালোভাবে মিশিয়ে বাসায় বসেই তৈরি করে ফেলুন একটি ন্যাচারাল হেয়ার মাস্ক।পরে সেটা মাথার স্ক্যাল্পে খুব ভালোভাবে লাগান এবং পুরো চুল জুড়ে এই প্রাকৃতিক হেয়ার মাস্কটি এপ্লাই করুন।আধা ঘন্টা বা এক ঘন্টা পর শ্যাম্পু করে ফেলুন।
ফলাফল: চুল আরও বেশি চকচকে হয় এবং আগের থেকে উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়।
৩. হেয়ার মাস্কের সাথে মিশিয়ে
আপনি চাইলে বাজারের যেকোন ভালো মানের হেয়ার মাস্কের সাথে কয়েকটি ভিটামিন ই ক্যাপসুল মিক্স করে সেই মিক্সচার চুলে এপ্লাই করতে পারেন।
ফলাফল: চুলের ক্ষতি হওয়া থেকে রক্ষা করে,চুলের আদ্রতা ব্যালেন্স করে।
৪. শ্যাম্পু বা কন্ডিশনারের সাথে মিশিয়ে
গোসল করার সময় বা চুল পরিস্কার করার সময় আপনি সাধারণত যে শ্যাম্পু বা কন্ডিশনার ব্যবহার করেন তার সাথে জাস্ট ১ টি ভিটামিন ই ক্যাপসুল মিশিয়ে নিন।পরে নরমালি আপনি যেভাবে শ্যাম্পু বা কন্ডিশনার করেন সেভাবেই মিশ্রণটি ব্যবহার করবেন।তবে ধোয়ার সময় সামান্য উষ্ণ পানি দিয়ে ধোয়া উত্তম।ভিটামিন ই ক্যাপসুল ব্যবহারের জন্য এটা সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি।
ফলাফল: চুলের ড্যামেজ প্রতিরোধ করে ও হারিয়ে যাওয়া চুলের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করে।
৫. জবা ফুলের সাথে মিশিয়ে
কিছু জবা ফুল সংগ্রহ করুন।অতঃপর সেই ফুলগুলোর পাপড়িকে ভালোভাবে ছেঁচে রস সংগ্রহ করে তার সাথে ১/২ টি ভিটামিন ই ক্যাপসুল মিশিয়ে নিন।পরে সেই মিশ্রণটিকে ভালোভাবে চুলের গোড়ায় লাগান।২০-৩০ মিনিট পর শ্যাম্পু দিয়ে চুল ভালোমতো ধুয়ে ফেলুন।
ফলাফল: চুল পড়া কমায়,নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে ও চুলের গোড়াকে স্ট্রং করে।
৬. দইয়ের সাথে মিশিয়ে
ছোট এক কাপ টক দইয়ে ৩-৪ টি ভিটামিন ই ক্যাপসুলের তেল মিশিয়ে নিন।পরে সেটা চুলে প্রয়োগ করুন।কিন্তু মাথার স্ক্যাল্পে লাগানো থেকে বিরত থাকুন।
ফলাফল: চুলে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করার পাশাপাশি চুল নরম ও আগা ফাটা রোধ করে।
৭. অ্যালোভেরা জেলের সাথে মিশিয়ে
বাজার থেকে আগে একটি অ্যালোভেরা সংগ্রহ করুন।তারপর সেই অ্যালোভেরা থেকে ভালো করে জেল বের করে আনুন।অতঃপর সেই অ্যালোভেরা জেলের পরিমাণ অনুসারে প্রয়োজন মাফিক ভিটামিন ই ক্যাপসুলের তেল মিক্স করে একটি প্যাক বানিয়ে নিন।এখন এই প্যাক টি চুলের গোড়ায় লাগিয়ে ভালোভাবে ম্যাসাজ করুন।ঘন্টাখানেক পরে শ্যাম্পু করে ফেলুন।
ফলাফল: চুল পড়া রোধ ও খুশকি দূর করতে সাহায্য করে।পাশাপাশি চুল থেকে শুষ্কতা দূর করে আদ্রতা বজায় রাখে।
৮. মাথার স্ক্যাল্পে সরাসরি ভিটামিন ই ক্যাপসুল প্রয়োগ
আপনি চাইলে ভিটামিন ই ক্যাপসুল থেকে তেল বের করে সেটা সরাসরি মাথার ত্বকে লাগাতে পারেন।পরে ৩০-৫০ মিনিট রেখে শ্যাম্পু করে নিবেন।চুলের আগায় চাইলে লাগাতে পারেন।তেলটা সরাসরি চুলের আগায় লাগালে সেটা চুলের আগা ফাটা দূর করে।তবে একসাথে বেশি পরিমাণে তেল সরাসরি মাথার স্ক্যাল্পে প্রয়োগ করতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।স্ক্যাল্পে চুলকানি অথবা চুল বেশি তৈলাক্ত হয়ে যেতে পারে।
ফলাফল: চুলের ক্ষয় রোধ করতে ও চুলকে সবসময় স্বাস্থ্যোজ্জ্বল রাখতে সহায়তা করে।
৯. চুলের আগায় সরাসরি ভিটামিন ই ক্যাপসুল প্রয়োগ
ভিটামিন ই ক্যাপসুল থেকে চিকন সুই বা পিন দিয়ে তেলটা যত্ন সহকারে বের করে সেটা সরাসরি চুলের আগায় লাগাতে পারেন।
ফলাফল: চুলের আগা ফাটা দূর করে।
ভিটামিন ই ক্যাপসুল কখন মাখতে হয়
ভালো ফলাফল পেতে ভিটামিন ই ক্যাপসুল মূলত রাতে ব্যবহার করা উত্তম।চাইলে আপনি সারারাত রেখে সকালে মাথা মাইল্ড শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে নিতে পারে।সপ্তাহে ১-২ বার এটি মাথায় প্রয়োগ করা যেতে পারে।অতিরিক্ত ব্যবহারে চুল তেলতেলে হয়ে যেতে পারে,মাথায় খুশকি ও ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে।
ভিটামিন ই ক্যাপসুল কি খাওয়া যায়
হ্যাঁ,ভিটামিন ই ক্যাপসুল খাওয়া যায়।তবে ডাক্তারের পরামর্শে এই ক্যাপসুল খাওয়া উচিত।মূলত এমন অনেক খাবার আছে যেগুলোর মধ্যে ভিটামিন ই থাকে।যেমন বাদাম,কুমড়োর বীজ,গরুর খাটি দুধ,ডিমের কুসুম,সূর্যমুখীর বীজ ইত্যাদিতে বেশ ভালো মানের ভিটামিন ই থাকে।এ সমস্ত খাবারেও ভিটামিন ই এর অভাব পূরণ না হলে সেক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন ই ক্যাপসুল সেবন করা যেতে পারে।
ভিটামিন ই ক্যাপসুল খাওয়ার নিয়ম
ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ভিটামিন ই ক্যাপসুল খাওয়া উচিত।কারণ ডাক্তার আপনার সাথে কথা বলে বুঝতে পারবে আপনার কি কি সমস্যা আছে,সমস্যাগুলোর তীব্রতা কত এবং সে সমস্যার জন্য আপনাকে কি মাত্রায় ভিটামিন ই ক্যাপসুল সেবন করা উচিত।
তবে ই ক্যাপসুল কোনো ড্রাগ নয়।এটি এক ধরনের সাপ্লিমেন্ট যা আপনার শরীরের ভিটামিন ই এর ঘাটতি পূরণ করে।ইন জেনারেল ক্ষেত্রে আপনি চাইলে ভিটামিন ই ক্যাপসুল ৪০০ আই ইউ প্রতিদিন ১ টা করে রাতে খাবারের পরে খাবেন।
যেই রাতে এই ঔষধ খাবেন সেদিন রাতের খাবারের তালিকায় একটূ ফ্যাটযুক্ত খাবার রাখতে পারেন।কারণ ভিটামিন ই ক্যাপসুল সাপ্লিমেন্টটি ফ্যাট সলিউবল ধরনের যা আপনার শরীরের ভিতর গিয়ে জল বা পানিতে দ্রবীভুত না হয়ে চর্বিতে গিয়ে দ্রবীভুত হয় এবং শোষণে সাহায্য করে।
চুলের জন্য ভিটামিন ই ক্যাপসুল কতদিন খেতে হবে
ভিটামিন ই ক্যাপসুল ৪০০ আই ইউ প্রতিদিন ১ টা করে খেলে ইন জেনারেল ক্ষেত্রে ১ থেকে ২ মাস খাওয়া যেতে পারে।তবে প্রত্যেকের শরীরের কন্ডিশন এক অবস্থায় থাকে না।বেশি লম্বা কোর্সে খেতে হলে অবশ্যই আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।





